শিশু-শিক্ষার্থীদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি’ - আমাদের ভাবনা বনাম আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গী।
‘শিশু-শিক্ষার্থীদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি’ - আমাদের ভাবনা বনাম আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গী।
মাত্র কিছুদিন হলো করোনা ভাইরাসকে হটিয়ে আবার আমরা উন্নয়ন-অগ্রগতির স্বাভাবিক গতিধারায় ফিরে এসেছি।করোনা ভাইরাসের কারণেই সমগ্র বিশ্বসহ বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অনলাইন ভিত্তিক ক্লাস ও অনলাইন ভিত্তিক পরীক্ষা প্রচলন শুরু হয় এবং তারই ধারাহিকতায় আমাদের ৭ থেকে ১১ বছরের বয়সের শিশুদের ভর্তি পরীক্ষা লটারির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হওয়ার System চালু হয়-যা’ অদ্যাবদি অব্যাহত আছে। আমরা আশা করছি,আমাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভর্তির জন্য আর কখনোই ঐ পুরানো অসুস্থ-প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা-পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে না।
কিন্তু আমাদের অভিভবকসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহল এতে কতটুকু খুশী হতে পেরেছেন-আমরা জানি না।যেখানে শিক্ষাটা কোচিং বাণিজ্য নামক কতকসাইবোর্ড -সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানও বিদ্যা-বণিকদের বাণিজ্যিক মানসিকতার অদম্য লোভের নিকট বন্দী।বিশেষতঃ যেখানে সচ্ছল,বিত্তবান ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ধনাঢ্য অভিভাবকরা কখনোই প্রত্যাশা করেন না যে-,দরিদ্র, দিন-মজুর,অসচ্ছলও সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন পরিবারের মেধাহীন সন্তানেরা তাদের সন্তানদের সাথে একই বেঞ্চে,একই কাতারে এক সাথে বসে লেখা-পড়া করুক। তদুপরি শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী যেখানে একেবারেই সেকেলে, সনাতন ও সময়ের সঙ্গে একেবারেই অনুপযোগী।
শিশুদের ভর্তি পরীক্ষা নামক ভর্তি -আযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়।
আমরা আমাদের কোমলমতি স্বর্গীয় এই শিশুদেরকে বিভীষিকাময় ঐ ভর্তি যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে পড়াশোনার অত্যুচ্চ চাপ ও পরীক্ষা ভীতি দ্বারা এযাবৎকাল ওদের প্রতি যে মানসিক পীড়ন করেছি - তা সভ্য সমাজের কোনো রাষ্ট্রে আছে বলে আমাদের জানা নেই।
কারণ এইরূপ ব্যবস্থা শিশুদের আবেগীয় ও বুদ্ধি ভিত্তিক বিকাশের জন্য অনুকূল তো নয়ই বরং এইরূপ অস্বস্থিকর অসুস্থ্য প্রতিযোগীতা শিশুদের সুপ্ত প্রতিভার জাগরন ও সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। আমি মনোবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানের ছাত্র নই তথাপিও আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো মনোবিজ্ঞানী ও এইরূপ ০৭ থেকে ১১ লেবেলের শিশুদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য এ’রকম ভীতিপ্রদ উদ্ভট প্রতিযোগিতার কোনো system চালু থাকুক- তা সমর্থন করবেন।
আমরা বুঝতে পারি না, কেনো আমাদের শিশুদেরমনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে দিতে হবে যে,শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হলে পরীক্ষা দিয়েই তাকে ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমাণ করতে হবে। কেন একজন শিশু শিক্ষার্থী ভাবতে পারবে না যে, তার চার পাশে যা’ আছে তার সবকিছুই শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর এবং সে নিজেও শ্রেষ্ঠ।এইরূপ ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হওয়ার অনুকূল পরিবেশ না দিয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার নামে যদি আমরা ‘শ্রেষ্ঠ’ ও ‘অশ্রেষ্ঠত্বের’ এই discriminent ওদের মগজে ঢুকিয়ে দেই,তাহলে বড় হয়ে তো ওরা দাম্ভিকতা প্রদর্শনকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে স্থির করে নেবে। আমরা ভাবতে পারি না, কেনো আমরা এই স্বর্গীয় শিশুদের বয়স উপযোগী একটি সারল্যময় শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ দিতে সক্ষম হবো না।
‘ শিক্ষা সুযোগ নয় -অধিকার’ এটাই যদি সত্য হয় তাহলে সকল শিশুদের জন্য সমকোয়ালিটি সম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেনো আমাদের থাকবে না, কেনো শিশুরা জানবে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটা ভালো ঐশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটা খারাপ। এই বয়সের স্বর্গীয় শিশুদের সামনে কেন এইরূপ ‘ভালো ও খারাপ’ ধারণার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বকে উন্মোচিত করে দিতে হবে- আমরা ভেবে পাই না।
আমরা তো জানি, শিক্ষা হবে সর্বজনীন এবং তা পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্য দিয়ে নয়, বরং তা হবে পারস্পরিক সহযোগীতামূলক পরিবেশের মধ্য দিয়ে।পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের এই ব্যবস্থা তো তাকে সুশীল নাগরিকে পরিণত না করে তাকে ভবিষ্যতে আরও অধিক আত্মঅহংকারী, দাম্ভিক নাগরিককে পরিণত করবে। তাছাড়া শিক্ষার concept তো এই-ই প্রতিযোগিতা হবে নিজের সঙ্গে নিজের-অন্যের সঙ্গে নয়। প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিজের ক্ষুদ্রতা, নিজের ব্যর্থতা নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে নিজের। নিজের লোভ ও পাপের বিরুদ্ধে নিজের, নিজের হীনতা ও মূঢ়তার বিরুদ্ধে-নিজের।
আমাদের ভাবতে অবাক লাগে, ভর্তি পরীক্ষার নামে শিশুদেরকে ভর্তি যুদ্ধে নামিয়ে আমরা অভিভাবকরা, শিক্ষকরা, শিক্ষাবিদরা ওদের প্রতি কি নিদারুন মানসিক নির্যাতন এযাবৎকাল করে এসেছি। ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর নামে একজন শিশুকে আমরা তার আনন্দময় জগৎ থেকে টেনে নামিয়ে গাদা -গাদা পড়া গেলানো, (সেটা সে হজম করতে পারুক আর নাই পারুক) তৃতীয় শ্রেণির একজন শিশুকে জবরদস্তি করে পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাস শেষ করানোসহ অত্যুচ্চ পরীক্ষার চাপের একটা ভীতিপ্রদ পরিবেশে রেখে তাদের সরল আনন্দময় জগৎটাকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছি। আমাদের শিশুদেরকে আমরা নক্ষত্র- খচিত নভোমন্ডলের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতে দেইনি, পূর্ণিমা রাতের আলোকিত নিসর্গের শোভা উপভোগ করার সুযোগ কখনো ওরা পায়নি, বর্ষার বৃষ্টির রিম-ঝিম শব্দের ছন্দময় সুর কখনো তাদেরকে আকৃষ্ট করেনি,সুবিশাল খেলার মাঠের ওদের আনন্দময় উপস্থিতি কখনো আমাদের নজরে পড়েনি।এরকম একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আমাদের শিশুদের শৈশব কালকে কাটাতে আমরা বাধ্য করেছি। যে বয়সে শিশুরা খেলবে,আনন্দ করবে,প্রকৃতির মতো সহজ, সতেজ রসালো হয়ে প্রকৃতির মতো বেড়ে উঠবে -তা’ না করে আমরা ওদেরকে পড়া-লেখার নামে মানবীয় আবেগ অনুভূতির বাইরে একটা যন্ত্র -দানব জেনারেশন সৃষ্টির প্রক্রিয়া চালু করে রেখেছি।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভর্তি সম্পর্কিত বিষয় তথা শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের মানসিকতার মোটামোটি একটা পরিচয় ও দৃষ্টিভঙ্গী এতোক্ষণের আলোচনায় আমরা তুলে ধরেছি।
এবারে আমেরিকার মানুষদের ‘উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি’ ও ‘শিক্ষা’ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমেরি্কার হার্বাডের মতো শ্রেষ্ঠ University-তে একজন শিক্ষার্থী তার পড়া শেষ করে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যেদিন তিনি তার সনদ গ্রহণ করেন,ঐদিন ঐ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সনদ প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে Convocation speaker স্পীকার বলেন, “আপনাদের কোনো একজনের মারা যাবার পরে আপনাদের কবরে পাথরে খোদাই করে কেউ এসে একজন লিখবে,”এই লোকটি হার্বাড ইউনিভারসিটিতে পড়েছে -এরচেয়ে অসম্মান জনক আর কিছুই নেই”। কারণ আপনি হার্বাডে পড়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছুই করেননি। আপনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেকে বড় করতে চেয়েছেন। আসলে আপনি বড় কিছুই করেননি।প্রকৃত অর্থে কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষকে বড় করে না,- মানুষ তার কর্মের দ্বারা প্রতিষ্ঠানকে বড় করে তোলে। আপনাকে দিয়ে হার্বাড বড় হবে- হার্বাডকে দিয়ে আপনি বড় হবেন না।
হার্বাডে পড়ে আপনি এমন কিছু করবেন যেটা দিয়ে হার্বাড সম্মানিত হয়,হার্বাড যেনো আপনাকে নিয়ে গর্ব করে। হার্বাডে আপনি পড়েছেন -এটা কোনো গর্বের বিষয় নয়”।
প্রিয় পাঠক,লক্ষ্য করুন-শিক্ষা সম্পর্কে ওদের কতো উন্নত,উচ্চ দৃষ্টিভঙ্গী।আর আমাদের! শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারাটাই আমাদের বড়ো গর্বের বিষয়,সেটা যেভাবেই হউক। আমি নিজে কি,নিজে কি করতে পারবো, কতুটুকু করার সক্ষমতা আমার আছে,আমাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠান গর্ব করতে পারবে কিনা-সেটা আমাদের নিকট কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। বড় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে চিত্ত নয়,বিত্ত অর্জন এবংদাম্ভিকতা প্রদর্শনই যখন ছিল শিক্ষার মূল লক্ষ্য,তাহলে এতে আর বিচিত্র কি!
রবীন্দ্রনাথের তোতা কাহিনী প্রবন্ধটা আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রনিধানযোগ্য।
রাজা মহাশয়ের খাঁচায় বন্দি একটি টিয়া পাখিকে ভদ্র ,কৃতজ্ঞ ও শিক্ষিত বানানোর দায়িত্ব নিয়ে তার ভাগিনা ও পারিষদবর্গ যে অভিনব কান্ড ঘটিয়েছিলেন -যা ছিল পাখিটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের অন্তরায় ও কৃত্রিম এবং এই কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় পিষ্ঠ হয়েই আমরা দেখেছি,একটা সময় পাখিটার নির্মম হয়।স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে এসে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় কাউকে বিকোশিত করতে চাইলে ও যে,মূলতঃ তার বিকাশের পথকে আরও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, কবি রূপকভাবে মূলতঃ এই বার্তাটাই দিতে চেয়েছেন গল্পটার মাধ্যমে। পাখিটা মারা যাওয়ার পর গল্পের শেষ লাইনটি “বাইরে নববসন্তের দক্ষিন হাওয়ায় কিশলয়গুলো দীর্ঘনিঃশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশকে আকুল করিয়া দিল।”-আমাদের জন্য খুবই প্রনিধানযোগ্য।
একটি পাখির করুন মৃত্যু হওয়ায় ,পাখিটা যে পরিবারের সদস্য সে পরিবারের অর্থাৎ ‘প্রকৃতির’ অন্তরে যদি এরূপ করুন আর্তি প্রতিধবনিত হয়, আর সেক্ষেত্রে আমাদের সন্তানদের প্রতি আমাদের অনুভূতি কেমন? আমরা কি করি? আমরা আমাদের সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নামে স্বাভাবিক পথ ছেড়ে, কৃত্রিম উপায় ওদের উপর চাপিয়ে দিয়ে যখন ওদের বিকাশের সমস্ত সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে ফেলি এবংওদের আত্বার মৃর্ত্যু ঘটাই এবং তারপরেও আমরা নির্বুদ্ধিতাবশত নির্লিপ্ত ও নির্বিকার থাকি, তখন বলতেই হয়,আহা! প্রকৃতির মতো অনুভূতিসম্পন্ন হতেও তো আমরা পারিনি!
একটি পাখিকে শিক্ষিত,ভদ্র ও কৃতজ্ঞ বানাবার অভিপ্রায়ে পাখির প্রতি রাজার পারিষদবর্গের মূর্খতাসুলভ পীড়নকে রবীন্দ্রনাথ গল্পাকারে ও পাখিটির করুণ মৃর্ত্যুতে পাখিটির পরিবারের তথা যে প্রকৃতিতে পাখিটি বেড়ে উঠে সে পরিবারের করুণ আর্তির যে আবেদন, “বাইরে নববসন্তের দক্ষিন হাওয়ায় কিশলয়গুলো দীর্ঘনিঃশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশকে আকুল করিয়া দিল।”- এই বাক্যটির মধ্য দিয়ে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় তিনি কতবড় অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন শিক্ষাবিদ ছিলেন।হায় কতকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলো একটা রবীন্দ্রনাথ আমরা পেলাম না।একটা রবীন্দ্রনাথ তৈরির কোনো আয়োজন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই।
লেখকঃ মো আমিনুল ইসলাম
সহকারি প্রধান শিক্ষক(রেলওয়ে পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়,কুমিল্লা।)
ও
Founder, Creative Math. & Science Academy
My Website:EduEarn.com
My facebook page:Online Job

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন